MYTHOLOGY & LEGENDS

বাঙালির প্রাচীন চাঁচর বা দোল উৎসবের ইতিহাস

বাঙালির প্রাচীন চাঁচর বা দোল উৎসবের ইতিহাস- চাঁচর পোড়া বা হোলিকা দহন 'আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বলো হরিবোল...'

 বাঙালির প্রাচীন চাঁচর বা দোল উৎসবের ইতিহাস

২২ শে ফাল্গুন চাঁচর পোড়া আর ২৩ শে ফাল্গুন দোল। আসলে চাঁচর আর দোল দুটি আলাদা আলাদা উৎসব কিন্তু দুটোরই একই উদ্যেশ্যে তা হইল সমস্ত শুভ শক্তির কাছে অশুভকে ধ্বংস করা।

বাঙালির চাঁচর বা দোল উৎসবের
বাঙালির প্রাচীন চাঁচর বা দোল উৎসবের ইতিহাস

সাধারণত বিভিন্ন জায়গায় দোলযাত্রার আগের দিন পালিত হয় ন্যাড়া পোড়া, বা চাঁচর উৎসব। শুকনো খড়কুটো, পাতা ও এক কথায় ‘বুড়ির ঘর’ জ্বালিয়ে এই উৎসব পালিত হয়। ঋতুচক্রের নিয়মে বসন্তের শুরুতেই শীতের শুকনো পাতা ঝরে যেতে থাকে। ঝরে যাওয়া শুকনো লতা-পাতা ও জঞ্জাল একত্রে পুড়িয়ে নতুনের সূচনাই হল চাঁচরের মূল লক্ষ্য। আর তার পরের দিন হয় দোল বা হোলিখেলা। এই নিয়ে একটি ছড়াও আছে

 'আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল, 

পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বলো হরিবোল...' 


  • কিন্তু এই সবের আসল ইতিহাস কি?
  • কেন এমন চাঁচর ও দোল উৎসব চালু হল?
  • কবে থেকেই চাঁচর ও দোল উৎসব চালু হল?
  • চাঁচর ও দোল উৎসবের উদ্যেশ্যে কি?

  • সকল প্রশ্নের উত্তর পাবেন এই পোস্টার মাধ্যমে—

চাঁচর পোড়া বা হোলিকা দহন —

চলতি ভাষায় একে চাঁচর, ন্যাড়া পোড়া বা বুড়ির ঘর পোড়া বলা হলেও পৌরাণিক মতে, বহু যুগ আগে অত্যাচারী রাজা হিরণ্যকশিপ প্রজাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কেউ ঈশ্বরের উপাসনা করতে পারবে না। হিরণ্যকশিপুর এক পুত্র ছিল। তার নাম প্রহ্লাদ ,সে ছিল ছোটবেলা থেকেই প্রকৃত বিষ্ণু ভক্ত। সে তার পিতার আদেশে কখনওই বিষ্ণুর উপাসনা ত্যাগ করে পিতার উপাসনা করতে রাজি ছিল না। হিরণ্যকশিপ পুত্রের এইরূপ আচরণে অত্যন্ত ক্রোধিত হয়েছিল। তাই সে নিজের সন্তানকে মারার জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে। হিরণ্যকশিপ প্রহ্লাদকে মেরে ফেলার জন্যে কখনো তার খাবারে বিষ প্রয়োগ করে, আবার কখনো মত্ত হাতীর পায়ের নীচে তার পুত্র প্রহ্লাদ কে ফেলে দেয়।

Prahlada

হিরণ্যকশিপুর প্রহ্লাদ




কিন্তু বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদ প্রতিবারই বেঁচে যায়। তাই সে তার পুত্রকে বিষধর সাপেদের সঙ্গেও কারারুদ্ধ করে রাখে, কিন্তু কোনভাবেই তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয় না। অবশেষে হোলিকা(হিরণ্যকশিপের বোন) দাদাকে জানিয়েছিল, ব্রহ্মার বরে পাওয়া চাদর যদি তিনি জড়িয়ে আগুনের মধ্যে বসেন, তাহলে তাঁর আগুন লাগবে না। কিন্তু অন্যরা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এই বরকেই কাজে লাগালেন হিরণ্যকশিপ। তাই প্রহ্লাদকে তার বোন হোলিকার কোলে বসিয়ে দু'জনের গায়েই আগুন ধরিয়ে দেন।


কিন্তু ঘটনার পটভূমি বদলে যায়। বিষ্ণু তার ভক্তকে প্রাণ বাঁচাতে ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে দিয়ে ওই চাদর দিয়ে দেন প্রহ্লাদের উপর। ঘটনাচক্রে চাদরে মুড়ে যান প্রহ্লাদ। পুড়ে ছাই হয়ে যায় হোলিকা। এই ঘটনার পর প্রজাগণ মনে করেন রাজা হিরণ্যকশিপুর অশুভ শক্তির চেয়ে ভক্তির শক্তি বেশি। ঈশ্বরের আশির্বাদে প্রাণে রক্ষা পান প্রহ্লাদ।
Holika dahan
হোলিকা দহন



সেই বিশ্বাস থেকে আজও পালিত হয় ন্যাড়া পোড়া বা চাঁচর পোড়া দোলের আগের দিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ অগ্নিকুন্ডের আয়োজন করা হয়, যা চাঁচর বা নেড়াপোড়া নামে পরিচিত। তাই অনেকেই এই উৎসবকে অশুভের উপর শুভের জিত বা খারাপের উপর ভালোর জিত বলেও বর্ণনা করে। তাই মানুষ অশুভ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তিকে আহবান করার জন্য আজও হোলিকা দহন ও নাড়া পোড়া বা চাঁচর পোড়ায়।

Holi
 হোলিকা দহন ও নাড়া পোড়া বা চাঁচর পোড়া

হোলিকা দহনের পরের দিন হয় দোল উৎসব।

  • কিন্তু কীভাবে এলো এই দোল উৎসব? 
  • এর ইতিহাস দেখলে কি জানা যায় ?
  • আদৌও কি রং খেলাই আসল উদ্যেশ্যে ?
  • আসুন জেনে নেওয়া যাক দোলের আসল ইতিহাস।


দোলযাত্রা বা বসন্ত উৎসব, হোলি বা দোল নামেই ডাকা হয়, দোল আসলে পুরনোকে বিদায় জানিয়ে ফাগুনের রঙে মেতে ওঠার উৎসব। রঙ খেলার উৎসব দোলযাত্রা। রঙ, আবির, গুলালে জীবনকে রঙিন করে তোলার নতুন এক আহ্বান দেয় দোল।
বৈষ্ণব বিশ্বাসীদের মতানুসারে, ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে বৃন্দাবনের নন্দকাননে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাধিকা দেবী এবং তার সখী ও অন্যান্য গোপীর সাথে রঙ খেলায় মেতেছিলেন। এই দিনকে স্মরণ করতেই দোলযাত্রার সূচনা হয়েছিলো। তাই প্রত্যেক বছর ফাগুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে, প্রচলিত পঞ্জিকা অনুসারে, ১৪তম রাতের পরবর্তী দিনে উদযাপিত হয় দোল। পণ্ডিতদের মতে, রাধাকৃষ্ণের দোলনায় দোল বা দোলায় গমন করা থেকেই ‘দোল’ কথাটির উৎপত্তি। এই দিন রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ স্নান করিয়ে দোলায় চড়িয়ে কীর্তনগান সহকারে সকালেই বেরিয়ে পড়েন ভক্তরা। এরপর শুরু হয় রঙ ছুঁড়াছুঁড়ির পালা। একে অন্যকে কতখানি রাঙিয়ে তুললো, সেই প্রতিযোগিতায় মাতা হয়।


Holi
হোলি উৎসব 



দোলযাত্রা বা হোলির সাথে মিশে আছে ধর্মের সব পৌরাণিক কাহিনী এবং লোকবিশ্বাস। আছে বিষ্ণু, দৈত্য, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের নানা পুরাণ কথা। কোনো এক বসন্তের পঞ্চম দিনে সেখানেই রাধা ও শ্রী কৃষ্ণের স্বর্গীয় ভালোবাসা রচিত হয়। তাই স্মৃতি হিসেবে দিনটি রঙ পঞ্চমী এবং প্রেমের উৎসব হিসেবে দিনটি উদযাপিত হয়।রাধাকৃষ্ণের দোলনায় দোলা থেকেই
‘দোল’ কথাটির উৎপত্তি।


Radha-Krishna-Dol
রাধা কৃষ্ণের দোল



দিনটা ছিল বসন্তপঞ্চমীর। আচমকাই রাধারানী খেয়াল করলেন উপর থেকে তাঁদের উপর কিছু ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ল। ব্যাপার কী? কৃষ্ণ যোগবলে জানলেন, দেবতারা স্বর্গে রঙের উৎসব পালন করছেন। রাধারানীও বায়না ধরলেন রং খেলার জন্য। কৃষ্ণ জানালেন, সেদিনটা দেবতাদের জন্যই থাক, অন্য একদিন রং খেলা যাবে’খন। রাধারানীর সে আবদারই পূরণ হল ফাল্গুনি পূর্ণিমায়।
ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, দোল পূর্ণিমায় বৃন্দাবনের নন্দন কাননে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার সখী দেবী রাধিকা দোলনায় দোলেছিলেন এবং দেবী রাধিকা ও গোপী-গণের সাথে রঙয়ের খেলায় মেতেছিলেন। রাধা-কৃষ্ণ দোল উৎসব করতেন পুষ্পরেণুর মাধ্যমে। সময়ের বিবর্তনে পুষ্পরেণু 'আবির' নামের লাল রঙের এক ধরনের পাউডারে রূপান্তরিত হয়েছে । দ্বাপর যুগ থেকে শ্রীকৃষ্ণের এ দোলযাত্রা বা দোল উৎসব চলে আসছে।






COMMENTS

BLOGGER
নাম

পৌরাণিক-কাহিনী,12,স্মৃতিরখাতা,2,pouranik-kahini,13,shakti-peeth,6,shivratri,2,Utsav,19,
ltr
item
পুরাণ কুটির: বাঙালির প্রাচীন চাঁচর বা দোল উৎসবের ইতিহাস
বাঙালির প্রাচীন চাঁচর বা দোল উৎসবের ইতিহাস
বাঙালির প্রাচীন চাঁচর বা দোল উৎসবের ইতিহাস- চাঁচর পোড়া বা হোলিকা দহন 'আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বলো হরিবোল...'
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhwtSpW3PMzNqIXuDfBNR2s4b_yzP6X21jxuxZXdtrGK8_y5fYiKu2v_fYhTdISJxFJTw5oobT-7xkVPCCFkND0t48jYBfU9PVoqmnxJ_kjUljRmzBd2FSqx1emL8BVfbxRF7SVDh2IG6H9ULlYhI5omjv8FSH7GBvTNApHIoXlTXI86z7MxYWlgUeepw/w640-h360/IMG_20230306_165721.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhwtSpW3PMzNqIXuDfBNR2s4b_yzP6X21jxuxZXdtrGK8_y5fYiKu2v_fYhTdISJxFJTw5oobT-7xkVPCCFkND0t48jYBfU9PVoqmnxJ_kjUljRmzBd2FSqx1emL8BVfbxRF7SVDh2IG6H9ULlYhI5omjv8FSH7GBvTNApHIoXlTXI86z7MxYWlgUeepw/s72-w640-c-h360/IMG_20230306_165721.png
পুরাণ কুটির
https://purankutir.blogspot.com/2023/03/%20%20%20%20%20%20.html
https://purankutir.blogspot.com/
https://purankutir.blogspot.com/
https://purankutir.blogspot.com/2023/03/%20%20%20%20%20%20.html
true
4791467589055299150
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy